
খাদ্য, বস্ত্র,শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিৎসা এগুলো মানুষের প্রধান মৌলিক অধিকার। একথা আমরা সকলে জানি। চিকিৎসা বাদে বাকী যে অধিকার গুলো রয়েছে, সেগুলো যদি কোনো মানুষের কম বা বেশি হয় তবুও কিন্তু মানুষের জীবন থেমে থাকবে না। ধরুন, আপনার ভাগ্যে কয়েকদিন খাবার জোটেনি বা আপনার খাদ্যের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছ। তবুও আপনি শুধু পানি পান করেও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় যদি বিলম্ব করা হয় বা ভুল চিকিৎসা দেয়া হয় বা ডাক্তার সাহেব দেরিতে হাসপাতালে আসেন তখন ঐ রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পরতে পারেন এবং মৃত্যুও হয়। এখনেই চিকিৎসার সাথে বাকি অধিকার গুলোর পার্থক্য। কাজেই চিকিৎসা অধিকার প্রত্যেক মানুষের সর্বোচ্চ অধিকার অনেকে মনে করেন।
সকলের দৃষ্টিতে একজন চিকিৎসক সমাজ বা রাষ্ট্রে অনেক সম্মানজনক মর্যাদার অধিকারী। জীবনকে সাজাতে সুস্থতার বিকল্প নেই। আর একজন মানুষের শারীরিক সুস্থতার জন্য একজন চিকিৎসকের বিকল্প আর বা কী আছে! পল্লী চিকিৎসক বা রেজিষ্টাড চিকিৎসক বলেন, মানুষের জীবন যখন সংকটাপন্ন হয় তখন এই ডাক্তারগন রোগীর সুস্থতার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকেন। কাজেই তারা মানুষের কাছে অনেক সম্মানীয়।
চিকিৎসকের দায়িত্ব কি শুধুই রোগীকে সুস্থ করে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি সার্বিকভাবে সমাজের প্রতিও সমান দায়িত্ব রয়েছে। একজন চিকিৎসকের মধ্যে থাকতে হবে সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা। এ দু’য়ের সমন্বয়ে রোগীকে উপযুক্ত সেবা দেওয়াই চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব। কর্তব্যবোধ ও মানবিকতাও তার পেশার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশভেদে চিকিৎসকের দায়িত্বে ভিন্নতা থাকতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব প্রায় সমান।
উপরে উল্লেখিত তিনটি বিষয়ই আমাদের দেশে যেন অতি সাধারণ বিষয়! আর এই অকাল মৃত্যুে যিনি পরিবারের একক আয়ের উৎস বা প্রিয়জনকে হারিয়ে কত পরিবার নিঃস্ব বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন হিসেব আমাদের কাছে না থাকলেও খবর মাধ্যমে আমরা বেশ কিছু তথ্য জানি।
আমরা একটা তথ্য দেখি একজন মেডিকেল স্টুডেন্টকে মেডিকেল অফিসার বানাতে সরকারি ভাবে কত খরচ পড়ে।
একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সময় একজন শিক্ষার্থীকে শুধু ভর্তি ফি হিসেবে এককালীন গড়ে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়। কিন্তু একটি বেসরকারি কলেজে দিতে হবে ২১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে ভর্তি ফি ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ও ইন্টার্নশিপ ফি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সে হিসাবে এ খরচ সরকারি মেডিকেলের চেয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ১৪২ গুণ বেশি। এ হিসেবটি কয়েক বছর আগের। বর্তমানে এর অঙ্ক আরও অনেক বেশি হবে।
জনগণের কষ্টে অর্জিত অর্থ দিয়ে কয়েক বছর এই সুবিধা নিয়ে অনেকে ডাক্তার হয়েছেন। এরপরে জনগণের অর্থ দিয়ে স্কলারশিপ নিয়ে বড় বড় ডিগ্রি অর্জনের জন্য দেশের বাইরে যায়। দেশের সর্বনিম্ন ভিক্ষুক থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত এই অর্থ যোগান দিয়ে থাকেন । সেই জনগণের চিকিৎসা সেবায় প্রকৃত ডাক্তার কতজন হবে!
চিকিৎসা সেবায় আমাদের ডাক্তারগন জনগণের কতটুকু আস্থা, বিশ্বাস ও গ্রহনযোগ্যতা নিতে পেরেছেন।
উপরে উল্লেখিত তিনটি বিষয় যদি একটু আলোচনায় করা যেতে পারে।
প্রথমতঃ আমরা প্রায় একটা অভিযোগ শুনি জরুরি রোগীদের প্রেপার ট্রিটমেন্টে বিভিন্ন জটিলতায় চিকিৎসা বিলম্ব হয় বা বিলম্বে ডাক্তার আসা। একজন অসুস্থ মানুষ বা রোগী যখন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য এসে ডাক্তার দেখতে পান না বা শুনেন যে, ডাক্তার সাহেব এখনো আসেননি তখন ঐ রোগীটি মানসিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়েন। এতেও তার জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে।
রোগীর এডমিশন থেকে শুরু করে বেড পাওয়া পর্যন্ত একটা সময় কিল হয়। এরপর প্রকৃত সেবা পেতে আরও অনেক সময় সময় ব্যয় হয়। এতে করে জরুরি রোগীর জীবন সংকটাপন্ন চলে যায়। কিন্তু কেন এই জটিলতা!
প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে একটা নিয়ম থাকে চেন অব কমান্ড।থাকে জবাবদিহিতা।
অনেক ডিপার্টমেন্টে এর কার্যকরীতাও রয়েছে। কিন্তু একজন ডাক্তারের কাজের জবাবদিহি দৃশ্যমান আমরা দেখি না। কারণ অনেক অভিযোগ রয়েছে ডাক্তারের অফিসে বিলম্বে আসা। অবশ্য সব ডাক্তার নয়। ধরুন গ্রাম থেকে উপজেলা শহরে একজন চিকিৎসা নিতে আসলে সাথে আর ২/১ জন আসতে পারে। কিন্তু ডাক্তার বিলম্বে আসায় যে ভোগান্তিতে পড়তে হয় -প্রথমত রোগীর কষ্ট বেড়ে যায়, রোগী আতঙ্কিত হয় এবং মানসিক অস্থিরতা দেখা দেয়। যেটা রোগীর জন্য জটিলতা তৈরি করে। এমনকি দেখা যায় ডাক্তার বিলম্বে আসায় তড়িঘড়ি রোগী দেখে দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে। আবার কোনো ক্ষেত্রে ডাক্তার ঐদিন হাসপাতালে আসেন না। দ্বিতীয়ত যারা তাদের সঙ্গে আসে তাদেরও স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটে এবং এতে করে রাষ্ট্রের উন্নয়নই বাধাগ্রস্ত হয়। যারা বিলম্বে আসে এখনে যদি সঠিকভাবে জবাবদিহি থাকতো, চিকিৎসা সেবায় মানুষের অনেক আস্থা বেড়ে যেত। কোন কোন রোগের কোন কোন ডাক্তার কখন এবং কোনদিন আসবেন বা আসবেন না এরকম যদি একটা তথ্যবোর্ড দৃশ্যমান থাকতো তাহলে রোগীদের অনেক সহায়ক হতো।
দ্বিতীয়তঃ ভুল চিকিৎসা প্রদানের কথাও কম শোনা যায় না! একজন সাধারণ রোগীর ক্ষেত্রে হয়তো অনেক সময় প্যারাসিটামলই যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু প্রেসক্রিপশনে দেখা যায় -অযথা বা অতিরিক্ত টেস্টসহ পরবর্তীতে অতিরিক্ত ঔষধ সেবনে সাধারণ রোগীকে বাধ্য করা হয়। এভাবে রোগী যখন শারীরিক জটিলতায় পরে নানা হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রেও রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই চিকিৎসককে তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করতে হয় প্রেসক্রিপশন, সার্টিফিকেট ও রসিদে। একজন চিকিৎসক রোগী দেখার জন্য কত টাকা নেন, তাও প্রকাশ্যে লিখে রাখার বিধান রয়েছে অনেক দেশে। প্রেসক্রিপশন এমনভাবে লিখতে হবে যেন সবাই তা বুঝতে পারে। ওষুধের জেনেরিক নাম, ব্র্যান্ডের নামও তিনি লিখবেন। এক্ষেত্রে রোগীর ভুল চিকিৎসা হলে ঐ সব ডাক্তারের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাড়াতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এরকম জবাবদিহিতার বন্দোবস্ত আছে বলে পরিলক্ষিত হয় না।
কেন দেশের সাধারণ জনগন চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য বা চিকিৎসা পেতে অনেক ভোগান্তির স্বীকার হতে হয়? অনেক সময় দেখা যায়, একজন সরকারি ডাক্তার রোগী দেখার সময় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত বা মোবাইল দেখছেন কথাও বলছেন! একজন ডাক্তার তাঁর পেশাগত কাজে রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেখে বা কেইস স্টাডি শুনে , তারপর প্রেসক্রিপশন করা উচিত।
গত ৮ ডিসেম্বর/২০২৪ আমি (লেখক নিজে) হাঁটু ব্যাথার জন্য রংপুর জেলার গংগাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাই।
তখন সময় সকাল ৯টা। আমি একটু সকালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হলো ফাস্ট টাইম ডাক্তারকে দেখিয়ে আমার পেশাগত কাজে যাবো। শুনলাম ডাক্তার আসার সময় হচ্ছে ৯.৩০। কিন্তু ৯.৩০ তো দূরের কথা ১০ টাতেও এরপর ডাক্তার আসলেন ১০.৩১ মিনিটে। এসেই ওনি ওনার চেম্বারে না ডুকে ওনার কলিগের চেম্বারে ডুকলেন। কথা বললেন, এরপর ইচ্ছে মতো তাঁর চেম্বারে বসলেন। আর আমি হাটুর প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে ডাক্তার এক্টিভিটিজ অবলোকন করলাম।
পরের ঘটনা সুযোগ হলে আর একদিন তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
নিদিষ্ট সময়ের পরে ডাক্তারের আগমন। বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেল। যদি মানুষের ধারনা এমন হতো ডাক্তার আসিবার পরে রোগীর সেবা পরিচর্যা করে রোগীটি মারা গেল ।
পরিশেষে,
সকলের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে বিনীতভাবে বলছি, একালে না হলেও পরকালে প্রত্যেকটি কাজের জন্য কঠিন জবাবদিহিতা হবে এবং জবাবদিহি মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া আর অপেক্ষা করবে ভয়াবহ শাস্তি! কাজেই আমরা যার যার কাজে আরও গতিশীল হই আরও দায়িত্বশীল হই। ইনশাআল্লাহ জীবন আরও সুখের হবে।
লেখক
মোঃ মুকুল মিয়া
প্রধান শিক্ষক, প্রাইম রেসিডেন্সিয়াল স্কুল
ও
গংগাচড়া উপজেলা প্রতিনিধি,
দৈনিক দেশ প্রতিদিন ও অনলাইন পত্রিকা ঢাকা পোষ্ট -৭১