
স্টাফ রিপোর্টার,সুৃৃমন চক্রবর্তী।
৩ বছর পর বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পুনরায় চালু সিজারিয়ান সেবা
প্রথম দিনেই সুস্থ কন্যাসন্তানের জন্ম, ‘এক টাকাও লাগেনি’—প্রসূতি সোমাইয়া আক্তার
দালালচক্র ও বেসরকারি ক্লিনিকের ওপর নির্ভরতা কমবে, স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষের মাঝে,দীর্ঘ তিন বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পুনরায় চালু হয়েছে সিজারিয়ান (সি-সেকশন) অপারেশন সেবা। সফলভাবে প্রথম সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে দরিয়াদৌলত গ্রামের প্রসূতি সোমাইয়া আক্তার (২৫) একটি সুস্থ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এ সেবা চালু হওয়ায় উপজেলার হাজারো গর্ভবতী মা ও তাদের পরিবারের মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে হাসপাতালটিতে সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ থাকায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের বিভিন্ন হাসপাতালে যেতে হতো। এতে একদিকে যেমন চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যেত, অন্যদিকে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে অনেক মা ও নবজাতক ঝুঁকির মুখে পড়তেন।৩ বছরের অপেক্ষার অবসান হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে ৩১ শয্যা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পরবর্তীতে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০০০ সাল থেকে এখানে প্রসূতি সেবা চালু থাকলেও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ও গাইনি চিকিৎসকের সংকটের কারণে গত প্রায় তিন বছর সিজারিয়ান অপারেশন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। তবে স্বাভাবিক প্রসব সেবা সীমিত পরিসরে চলমান ছিল। সম্প্রতি অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. হাবিবুর রহমান এবং গাইনি ও প্রসূতিবিদ ডা. সুস্মিতা হাসপাতালে যোগদান করায় পুনরায় সিজারিয়ান অপারেশন চালুর পরিবেশ তৈরি হয়। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সোমবার সফলভাবে প্রথম অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়।এক টাকাও লাগেনি, ওষুধও হাসপাতাল থেকেই পেয়েছি’ প্রথম সিজারের রোগী সোমাইয়া আক্তার ও তাঁর স্বজনরা আনন্দ প্রকাশ করে বলেন,“আমরা কোনো টাকা দিইনি। ডাক্তার বিনামূল্যে সিজার করেছেন। হাসপাতাল থেকেই প্রয়োজনীয় ওষুধ পেয়েছি। সেবার মানও খুব ভালো। গতকাল ভর্তি হয়েছিলাম, আজ সুস্থ কন্যাসন্তানের জন্ম হয়েছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এটি সত্যিই অনেক বড় আশীর্বাদ।”
পরিবারের সদস্যরা জানান, আগে হলে হয়তো তাদের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হতো, যেখানে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা ছিল কষ্টসাধ্য।
হাজারো পরিবারের দুর্ভোগ কমবে নদীবেষ্টিত ও প্রত্যন্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত বাঞ্ছারামপুরে দীর্ঘদিন সরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান সেবা বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে গভীর রাতে প্রসূতির অবস্থা জটিল হলে দ্রুত অন্য জেলায় নেওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাঞ্ছারামপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মোল্লা নাসির আহমেদ বলেন,“সরকারি হাসপাতালে সিজার সেবা চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। এতদিন বেসরকারি ক্লিনিকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করতে হতো। এখন দরিদ্র পরিবারগুলোও নিরাপদ মাতৃসেবা পাবে।” দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমবে স্থানীয় সমাজসেবী ফাতমা বেগম বলেন,“সরকারি হাসপাতালে সিজার সেবা বন্ধ থাকার সুযোগে অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও দালালচক্র রোগীদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করত। অনেক পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত সেবা চালু হওয়ায় এসব অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে বলে আমরা আশা করছি।”তিনি আরও বলেন, এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের এই দাবিটি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা বলছে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রঞ্জন বর্মন বলেন,“প্রয়োজনীয় অপারেশন থিয়েটার, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো আগে থেকেই ছিল। মূল সমস্যা ছিল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট। বর্তমানে সেই সংকট অনেকটাই দূর হয়েছে। এখন থেকে নিয়মিত সিজারিয়ানসহ সব ধরনের প্রসূতি সেবা দেওয়া হবে। রোগীদের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আগেভাগে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে হাসপাতালের মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।স্বস্তি ফিরেছে বাঞ্ছারামপুরবাসীর মাঝে
সরকারি হাসপাতালে পুনরায় সিজারিয়ান সেবা চালু হওয়াকে বাঞ্ছারামপুরবাসী স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এ উদ্যোগ শুধু চিকিৎসা ব্যয় কমাবে না, বরং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করবে এবং মা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করে এই সেবা যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখা হয়। মাতৃস্বাস্থ্যে নতুন দিগন্ত: বাঞ্ছারামপুর সরকারি হাসপাতালে পুনরায় শুরু সিজার সেবায়,তাহলেই বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের আস্থার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।