
মোঃ হাবিবুর রহমান মল্লিক
৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। প্রতিবছর এই দিনে বিশ্বজুড়ে শিক্ষক সমাজের অবদানকে স্মরণ করা হয়। ফুল, শুভেচ্ছা, আলোচনা সভা ও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শিক্ষককে সম্মান জানানো হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন কি আমরা নিজেদের সামনে রাখি —যাঁরা একটি জাতির ভবিষ্যৎ তৈরি করেন, তাঁদের আমরা বাস্তবে কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা দিতে পেরেছি?
আমরা চাই আমাদের সন্তানরা জ্ঞানী হবে, নৈতিক হবে, দক্ষ হবে, দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হবে। আমরা চাই তারা হবে প্রথম শ্রেণির নাগরিক। কিন্তু সেই নাগরিক তৈরির প্রধান কারিগর শিক্ষক যদি সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা ও যথাযথ স্বীকৃতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেন, তাহলে প্রথম শ্রেণির নাগরিক তৈরির প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত?
শিক্ষক শুধু পড়ান না, মানুষ তৈরি করেন
একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেখান না। তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎ তৈরি করেন, প্রশ্ন করতে শেখান, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখান, সত্য ও ন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করেন। তাঁর কথাবার্তা, আচরণ, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীর মনে দীর্ঘদিন প্রভাব ফেলে।
একজন চিকিৎসক একজন রোগীর জীবন রক্ষা করেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন, একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন; আর একজন শিক্ষক তৈরি করেন তাঁদের সবাইকে।
তাই শিক্ষককে অবহেলা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিতকে দুর্বল করা।
তবু মেধাবীরা শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ করছে না কেন?
একসময় শিক্ষকতা ছিল সমাজের অন্যতম সম্মানজনক পেশা। একজন শিক্ষক ছিলেন জ্ঞান, নৈতিকতা ও সামাজিক নেতৃত্বের প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শিক্ষকতার দায়িত্ব ও প্রত্যাশা বেড়েছে বহুগুণ। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীর ফলাফল, অভিভাবকের প্রত্যাশা, বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রশাসনিক কাজ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার সবকিছুর চাপ শিক্ষকের ওপর ক্রমাগত বাড়ছে।
অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই পেশাগত মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা, ক্যারিয়ার অগ্রগতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সেই অনুপাতে বাড়েনি।
ফলে দেশের মেধাবী তরুণদের একটি অংশ শিক্ষকতাকে জীবনের প্রথম পেশাগত পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করছে না।
এটি শুধু শিক্ষকতার সংকট নয়। এটি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা।
কারণ একটি দেশের শ্রেণিকক্ষে যদি সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্য মানুষদের আকৃষ্ট করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
শিক্ষককে মর্যাদা না দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব?
শিক্ষার মান নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি। ভালো ফলাফল, আধুনিক ভবন, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, নতুন পাঠ্যক্রম, ডিজিটাল শিক্ষা এসব নিয়ে পরিকল্পনা হয়। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন, সেই শিক্ষক কেমন আছেন —এই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন উদ্বিগ্ন, অনিরাপদ ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপে থাকা শিক্ষককে দিয়ে সর্বোচ্চ মানের সৃজনশীল শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।
তাই শিক্ষকের কল্যাণ কোনো আলাদা বিষয় নয়; এটি শিক্ষার মানেরই অংশ।
রাষ্ট্রের করণীয় কী?
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষকনীতি।
শিক্ষকদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন ও ভাতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষকতার মধ্যেও ‘মাস্টার শিক্ষক’, ‘লিড শিক্ষক’ সহ সুস্পষ্ট পেশাগত ক্যারিয়ার কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব কমিয়ে শিক্ষককে তাঁর মূল দায়িত্ব — পাঠদান, শিক্ষার্থীর বিকাশ ও শিক্ষার মানোন্নয়ন — এ মনোনিবেশের সুযোগ দিতে হবে।
প্রয়োজন মানসম্মত ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, উদ্ভাবনী শিক্ষাপদ্ধতি প্রয়োগের স্বাধীনতা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা।
শিক্ষায় বৈষম্য কমাতে অভিন্ন কাঠামো প্রয়োজন
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক কাঠামো বিদ্যমান। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধায় পার্থক্য রয়েছে।
এই বৈষম্য কমিয়ে একটি অভিন্ন জাতীয় শিক্ষক ও পেশাগত কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
এ ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা, অবকাঠামো, শিক্ষার মান এবং অন্যান্য স্বচ্ছ মানদণ্ডের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে জাতীয়করণের একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এটি যেন হঠাৎ আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে, বরং পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠান যাচাই, প্রয়োজন নির্ধারণ ও সক্ষমতা মূল্যায়নের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। একই সঙ্গে জাতীয়করণের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের মান, জবাবদিহি, শিক্ষার গুণগত মান এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ শিক্ষকের মর্যাদা ও জবাবদিহি—দুটিই পাশাপাশি প্রয়োজন।
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে
শিক্ষককে শুধু পরীক্ষার ফলাফল তৈরির কারিগর হিসেবে দেখলে চলবে না। একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস তৈরি করেন, তার স্বপ্নকে পথ দেখান, ব্যর্থতার পর উঠে দাঁড়াতে শেখান।
একজন শিক্ষকের একটি ভালো কথা কখনো কখনো একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু ৫ অক্টোবর শুভেচ্ছা জানানো নয়। শিক্ষককে সম্মান করার অর্থ হলো তাঁর কাজের পরিবেশ, পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস হোক নতুন অঙ্গীকারের দিন
৫ অক্টোবর তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়। এটি হতে পারে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মেধাবী তরুণ শিক্ষকতাকে দ্বিতীয় সারির পেশা হিসেবে নয়, গর্বের ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বেছে নেবেন।
আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষক তাঁর পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপদ থাকবেন, শ্রেণিকক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন এবং তাঁর মেধা ও পরিশ্রম যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একজন শিক্ষককে দেখে শিক্ষার্থীরা বলবে “আমি বড় হয়ে একজন ভালো শিক্ষক হতে চাই।“
কারণ জাতির ভবিষ্যৎ শুধু সংসদ, অফিস, আদালত কিংবা কারখানায় তৈরি হয় না; জাতির ভবিষ্যৎ তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষে। আর সেই শ্রেণিকক্ষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর।
তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক —শিক্ষককে শুধু সম্মানিত করার কথা নয়, শিক্ষকতার মর্যাদা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ।‘
কারণ আমরা যদি প্রথম শ্রেণির নাগরিক চাই, তাহলে তাঁদের গড়ে তোলার কারিগরকে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদায় রেখে সেই স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব নয়।
এতে হঠাৎ আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে একই দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের জন্য অধিকতর সমতাভিত্তিক কাঠামো তৈরি করার সুযোগ থাকবে। জাতীয়করণের পাশাপাশি জবাবদিহি, শিক্ষার মান, শিক্ষক নিয়োগের মানদণ্ড ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ শিক্ষকতার বৈষম্য কমানো মানে শুধু শিক্ষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের জন্য সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ। ভালো শিক্ষক তৈরি না করে ভালো নাগরিক তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি সরাসরি প্রশ্ন—শিক্ষক যদি দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদার নাগরিক হন, তাহলে তিনি কীভাবে প্রথম শ্রেণির নাগরিক তৈরি করবেন?
লেখকঃ প্রধান শিক্ষক, সেনহাটী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, দিঘলিয়া, খুলনা।