
মাওলানা শাহ মোঃ মাসউদুর রহমান (আইএবি)
পৃথিবীপৃষ্ঠে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি হলো রাষ্ট্র। যে কোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ন্যায় রাষ্ট্রেরও লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও এজেন্ডা থাকে।
রাষ্ট্রের জীবনেও উত্থান, পতন ও ধ্বংস আছে। একটি বিশাল বাহনের ন্যায় রাষ্ট্র জনগণকে দুটি গন্তব্যস্থলের একটিতে নিতে পারে: হয় জান্নাতে, অথবা জাহান্নামে। তৃতীয় কোন গন্তব্যস্থল নাই।
লক্ষভেদে রাষ্ট্র ইসলামী হতে পারে, অনৈসলামীও হতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধানতম দায়িত্বটি রাস্তাঘাট,স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা কলকারখানা গড়া নয়, বরং সেটি হলো রাষ্ট্রে বসবাসকারী নাগরিকদের জান্নাতের যোগ্য রূপে তোলা। রাষ্ট্ররূপী বিশাল জাহাজটি তখন জান্নাতের বাহনে পরিণত হয়।
কাউকে হাজার কোটি টাকার দেয়ায় এমন কল্যাণ নাই। রাষ্ট্র সে কাজটি একমাত্র তখনই করতে যখন সে রাষ্ট্রে ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়। সে রাষ্ট্রের রাজনীতি, প্রশাসন ও আদালতের মূল মিশন হয় অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করা।
সে জন্য অপরিহার্য হলো, রাষ্ট্রের বুকে শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা দেয়া।
এমন রাষ্ট্রকেই ইসলামী রাষ্ট্র বলা হয় –যার প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন খোদ মহান নবীজী (সা:)। কোন রাষ্ট্রকে ইসলামী করার জিহাদ না হলে সেটি অনৈসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং সেটি জনগণকে জাহান্নামে নেয়ার বাহন হয়।
মক্কায় ১৩ বছর বসবাস কালে নবীজী (সা:)’র পক্ষে তেমন একটি ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ সম্ভব হয়নি। কিন্তু মদিনায় হিজরতের পর প্রথম দিন থেকেই তেমন একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১০ বছর যাবত সে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন।
আজও সর্ব কালের এবং সকল দেশের প্রতিটি মুসলিমদের জন্যই এটিই হলো নবীজী (সা:)’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বশ্রেষ্ঠ সূন্নত। নবীজী (সা:)’র সূন্নত অসংখ্য।
তবে মুসলিমগণ সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র ও সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার প্রতিষ্ঠা দিতে সফল হয়েছিলেন নবীজী (সা:)’র এই সূন্নতটি অনুসরণ করার কারণে। তাতে সম্ভব হয়েছিল মহান আল্লাহতায়ালার দ্বীনকে তাঁর নিজের জমিনে বিজয়ী করার এবং মুসলিমদের বিশ্বশক্তি রূপে বেড়ে উঠার।
রাষ্ট্র তো বিশ্বের বহু জাতিই গড়ে। বহু নৃশংস দুর্বৃত্তও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, পিতা ও নেতা হয়। কিন্তু মুসলিমগণ রাষ্ট্র গড়লে সে রাষ্ট্রে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা দেয়া হবে এবং সেটিকে জান্নাতে পৌঁছার বাহন রূপে গড়ে তোলা হবে -সেটিই তো কাঙ্খিত ও স্বাভাবিক।
তাতেই তো ঈমানের প্রকাশ। কিন্তু সেটি না হলে বুঝতে হবে নবীজীর সূন্নত পালিত হয়নি।
আরো বুঝতে হবে, নবীজী (সা:) যে ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেছেন -সে ইসলামের বাস্তবায়ন হয়নি। তখন প্রকাশ পায়, মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র এজেন্ডার সাথে মুসলিমদের গাদ্দারী।
তখন রাষ্ট্র অধিকৃত হয় শয়তানী শক্তির হাতে।
তাই একটি দেশের জনগণ ও শাসকগণ মহান আল্লাহতায়ালার পবিত্র এজেন্ডা নিয়ে বাস করে, না শয়তানের এজেন্ডা নিয়ে বাস করে –সেটি সুস্পষ্ট টের পাওয়া যায় রাষ্ট্রের রাজনীতিতে অন্যায়ের নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং আদালতে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা আছে কি নাই -সেটি দেখে।
ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সেখান শরিয়তের প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজটি কোন নিছক কোন দল বা নেতার দায়িত্ব নয়। প্রতিটি মুসলিমকে যেমন নিজের নামাজ-রোজা নিজে পালন করতে হয়, তেমনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে নিজের শ্রম, নিজের অর্থ, নিজের মেধা ও নিজের রক্তের বিনিয়োগও করতে হয়।
একাজ প্রত্যেকের। নবীজী (সা:)’র যুগে এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দেয়ার কাজে জিহাদ করেননি।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সেটিকে প্রতিরক্ষা দেয়ার কাজে প্রায় ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়ে গেছেন। কোন ব্যক্তি বা দলকে বিজয়ী করার মধ্যে আখোরাতে কোন কল্যাণ নেই।
কল্যাণ তো ইসলামী রাষ্ট্র ও সে রাষ্ট্রে শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজে কতটা বিনিয়োগ হলো নিজ মেধা, নিজ অর্থ, নিজ শ্রম ও নিজ রক্তের -তার উপর। ঈমানদার তো এমন বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে নিজেকে মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মাগফিরাত-লাভ ও জান্নাত-লাভের উপযোগী করে।
একমাত্র এ পথেই একজন ব্যক্তি যেমন পূর্ণ ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠে, তেমনি নির্মিত হয় সভ্যতর রাষ্ট্র ও সমাজ। এবং এভাবেই মুসলিমদের গড়া রাষ্ট্র জান্নাতে পৌঁছার বাহনে পরিণত হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে একটি আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র নির্মাণ এবং সমাজ ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলিমদের ঐক্য নিয়ে কিছু মূলনীতি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজের মূল লক্ষ্য
ইসলামী সমাজ বা রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনে ইনসাফ (ন্যায়বিচার), শান্তি, নৈতিকতা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
• ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন..." (সূরা আন-নাহল: ৯০)।
• জনকল্যাণ: একটি প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র জনগণের মৌলিক অধিকার (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা) নিশ্চিত করতে বাধ্য।
• ধর্মীয় স্বাধীনতা: ইসলামে জোর-জবরদস্তির কোনো স্থান নেই। অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার ও জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
২. ঐক্যের গুরুত্ব (উম্মাহর ঐক্য)
মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নির্দেশ। কুরআন ও হাদিসে অনৈক্য ও দলাদলি বর্জনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে:
• কুরআনের নির্দেশ: "আর তোমরা সকলে আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না..." (সূরা আল-ইমরান: ১০৩)।
• পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব: মুসলিমদের একটি সীসাঢালা প্রাচীর বা একটি দেহের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে এক অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হলে পুরো দেহ তা অনুভব করে।
৩. সময়ের দাবি ও বর্তমান বাস্তবতা
বর্তমান বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে ইসলামী শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখা জরুরি:
• মতভেদ দূরীকরণ: ছোটখাটো উপদলীয় বা ফিকহী (তাত্ত্বিক) মতপার্থক্য পাশে সরিয়ে রেখে বৃহত্তর কল্যাণে এক হওয়া প্রয়োজন।
✍️
মাওলানা শাহ্ মুহাঃ মাসউদুর রহমান,
সহ-সভাপতি আইএবি ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ শাখা!!
সম্পাদক ও প্রকাশক : আজিজুর
রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : মাহফুজুর
রহমান